মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

খেলাধুলা ও বিনোদন

নৌকাবাইচঃ

বাঙালির ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলাধুলা মধ্যে নৌকাবাইচ সবচেয়ে জনপ্রিয়। চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলায় অতি প্রাচীনকাল থেকেই নৌকাবাইচ এর প্রচলন রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে নৌকাবাইচ  অনুষ্ঠিত হতো। বিভিন্ন উৎসবে উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হতো বাইচ। শিবগঞ্জ অঞ্চলের বাইচের স্থানগুলো হচ্ছে- বিরামপুর, শিবগঞ্জ, গোসাইবাড়ী, ধাইনগর, শুক্রবাড়ি, দামস, চককীর্তি, আখহীরা শৈল্যা, চককীর্তির দাড়া প্রভৃতি। আউস ধান কাটার পর বিনোদনের জন্য হোগলার দামস, শুক্রবাড়ি, দামস, আখহীরা শৈল্যা, অরুণবাড়ি বেহুলা, কোপরা গোসায়বাড়ি, ধাইনগরের জলাশয়ে এ নৌকাবাইচ হতো। শিবগঞ্জ উপজেলার বিরামপুরস্থ বাশ বাড়িয়ার বিলের পাশে চারদিনব্যাপি মেলা বসিয়ে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হতো। আউসধান উঠার পর বাইচ উপলক্ষে কখনো কখনো আলকাপ গানের আসরও বসানো হতো। নৌকা বাইচেঁ যারা দাড় টানে তাদের পাইট বলা হয়। তাদের গায়ে থাকতো একই রঙের জার্সি। একটি নৌকায় থাকে ১জন মাঝি ১জন উৎসাহদাতা, ৮জন পাইট অথবা ৬জন পাইট। গলুইতে যিনি বসেন তাকে গলুইর পাইট বলা হয়। আর থাকতো চ্যালোটের পাইট। গলুইর পাইট থাকে বামে আর চ্যালাটের পাইট বসে ডানে। বাইচের সময় নৌকায় আরও একজন থাকে, তাকে বলা হয় চড়নদার বা জাজ। বাইচের দুরুত্ব ১ থেকে ২ মাইল নির্ধাররণ করা হয়ে থাকে। বাইচগুলো হতো উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা  থাকতো প্রচুর। ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্ত নৌকা বাইচ চলতো।

 

আলকাপ গানঃ

নবাবগঞ্জ জেলায় প্রচলিত এক শ্রেণীর গানের নাম ‘আলকাপ’। এর অর্থ হলো হাস্য কৌতুক। গম্ভীরা যাত্রা থিয়েটার প্রভৃতির মতো আলকাপও পল্লী সংস্কৃতির বাহক। পল্লীর পথে ঘাটে মাঠে প্রান্তরে নদী-নালায়, রাখাল বালক, কৃষক, মাঝি এ গানের সংরক্ষক। কেননা এ গান রচয়িতারা কেউ অশিক্ষিত, কেউবা সামান্য শিক্ষিত। আসরে গান গাওয়ার পর আর কোন খোজ রাখে না, সুতরাং পল্লীর রাখাল, কৃষক মজুর ও নৌকার মাঝি এ গান শোনার পর ইচ্ছে মতো গেয়ে থাকে। অন্যান্য গানের মত আলকাপও লোক সংগীতের প্রধান অঙ্গ। নবাবগঞ্জ অঞ্চলের লোক সঙ্গীতের ইতিহাসে এটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। এর রচয়িতাদের সরকার বলা হয়ে থাকে। এ গান কখন কিরূপে বর্তমান রূপ লাভ করেছে  তা জানা যায় নি।

 

আলকাপ গানের উৎপত্তি সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে। গম্ভীরা গানের জন্মদাতা আলকাপ গান, একথা এম, আমজাদ আলীর সাহেবের ‘আলকাপ গান’ প্রবন্ধে (আজাদ সাহিত্য মজলিশ ৯ই মে ১৯৬৪ সংস্করণ) উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গম্ভীরা, সত্য পীরের গান ও মনসার ভাজন হতে আলকাপ গানের সৃষ্টি এবং এটি শিবগঞ্জ উপজেলার নিজস্ব সম্পদ। প্রায় শতবর্ষ পূর্বে বোনাকানা নামক জনৈক ব্যক্তি এ গানের বর্তমান রূপ দান করেন। বোনা কানা গম্ভীরা গানও রচনা করতেন। আলকাপ গানের আসরে কয়েকজন লোক এবং এক বা একাধিক ‘‘ছোকরা’’ থাকে। ছোকরারা স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করে থাকে। গান আরম্ভের সময় বন্দনা গাওয়া হয়। বন্দনা গম্ভীরা জাতীয় গান। এতে দেশে নানা সুবিধা অসুবিধা, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আলোচনা থাকে। গল্পাকারে আলকাপ গান গাওয়া হয়। পূর্বে হিন্দু শাস্ত্রের আলোচনা ছিল এ গানের একমাত্র বিষয়বন্তু পরবর্তীতে সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আলোচনাও এ গানে স্থান পায়। শিবগঞ্জের মানিক সরকার ও তেলকুপির গোবিন্দ চন্দ্র আলকাপ গান রচনায় খ্যাতি লাভ করেন। গানের শিল্পীরা দলবদ্ধভাবে আসন নিয়ে বসে। একদলের গান শেষ হলে অন্য দল আরম্ভ করে, নৃত্য বাদ্য ঝংকারের মাধ্যমে গানের শেষ হয়। ছোকরারা নৃত্যকলা প্রদর্শন করে। তবলা, হারমোনিয়াম, জুরি প্রভৃতি বাদ্য যন্ত্র থাকে, আসরে একবার কোন পক্ষের সরকার প্রতিপক্ষের সরকারকে প্রশ্ন করে। প্রতিপক্ষের সরকার তার প্রশ্নের উত্তর দেয় এবং তাকে আর এক প্রশ্ন করে। এই প্রশ্ন উত্তরে কে কত কৌতুক ও হাসির হিল্লোল তুলতে পারে দর্শকরা তাই উপভোগ করে। লোক সঙ্গীতের এক অনন্য সম্পদ আলকাপ সংগ্রহের উদ্যোগ দেশীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

 

মেয়েলি গীতঃ

 মেয়েলি গীত লোকসংগীতের একটি উল্লেখযোগ্য ধারা। নারী সমাজের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, কামনা বাসনার বিচিত্র উপাদানের আকার মেয়েলি গীতের ভাব সম্পদ। প্রকৃতপক্ষে মেয়েলি গীত মেয়েদের জীবনবেদ স্বরূপ। শিবগঞ্জ অঞ্চল মেয়েলি গীতে সমৃদ্ধ। এখানকার পালা পার্বনে যেমন- আকিকা, মুসলমানী ও বৈবাহিক উৎসবে মেয়েলি গীতের ভূমিকা মূখ্য।