মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ব্যবসা বাণিজ্য

1ব্যবসা-বাণিজ্যঃ

 

এককালে শিবগঞ্জ একটি কর্ম-চঞ্চল স্টিমার স্টেশন ছিল। লালগোলা ঘাট হতে নিয়মিতভাবে মহানন্দার উপর দিয়ে শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, ইংরেজ বাজার হয়ে রাজমহল পর্যন্ত এবং পদ্মার উপর দিয়ে মণিহার ঘাট, সাহেবগঞ্জ মুঙ্গের, ভাগলপুর প্রভৃতি স্থান পর্যন্ত স্টিমার যাতায়াত করত। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বৃটিশ আমলে গোদাগাড়ী হতে কাটিহার পর্যন্ত রেল লাইন বসানো হয়। রাজশাহীতে তখনও পর্যন্ত রেল লাইন হয়নি। রেলগাড়ী চালু হওয়ার পরও বহুদিন পর্যন্ত স্টিমার চলাচল অব্যাহত ছিল। এভাবে শিবগঞ্জ তথা নবাবগঞ্জ ক্রমে ক্রমে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্ররূপে গড়ে উঠে। এভাবে তদানীন্তন মালদহ জেলার মধ্য স্থানটি অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। এমন অট্ট্রালিকাবহুল থানা হেড কোয়ার্টর উত্তর বাংলায় আর  কোথাও ছিল না। এই স্থান হতেই বরেন্দ্র অঞ্চলের ধান চাউল, দিয়াড়ের আম, রেশম পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় এবং কলকাতায় রফতানী  হতো। তৎকালে এ অঞ্চলে উৎপন্ন পাট ও অন্যান্য দ্রব্য লালগোলোঘাট ও ধুলিয়ান দিয়ে অন্যান্য স্থানে ও প্রেরণ করা হতো। বর্তমানে শিবগঞ্জ উপজেলার ব্যবসা বানিজ্য আবর্তিত হয় মূলত আম, আখ ও সোনামসজিদ স্থল বন্দরকে কেন্দ্র করে।

 

আম বাজারঃ

মে মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত আমকে কেন্দ্র করে শিবগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে আমের বাজার চালু হয়। এ সমস্ত বাজারে ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেনা-বেচা চলে। প্রতিটি বাজারে কয়েক মাসের জন্যে গড়ে ওঠে আমের আড়ত। এসমস্ত আড়ত আম কিনে পাঠিয়ে দেয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। হাজার হাজার মানুষ জড়িত হয়ে পড়ে আম ব্যবসার সঙ্গে। যেহেতু আমকে কেন্দ্র করে অসংখ্য মানুষের সমাবেশ ঘটে সেহেতেু ব্যবসা বানিজ্যের অন্যান্য সেক্টর যেমন- রেস্টুরেন্ট, পরিবহন ইত্যাদিতে তেজীভাব পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া আমের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজনের আয় উপার্জন ও বেড়ে যায় বিধায় তাদের ক্রয়ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায় যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যবসা বানিজ্যের সকল সেক্টরে। শিবগঞ্জের কানসাট আমের বাজার বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ আম বাজার। এ বাজার থেকে আম প্রেরণ করা হয় সমগ্র বাংলাদেশে। তাছাড়া শিবগঞ্জ, রানীহাটি প্রভৃতি জায়গায়ও বসে আমের বাজার। মূলত আমের মৌসুমে শিবগঞ্জ উপজেলার প্রতিটি মোড়ে বসে আমের আড়ৎ।

 

গুড় বাজারঃআখ শিবগঞ্জের দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল। এ অঞ্চলে চিনিকল না থাকায় স্থানীয়ভাবে আখ মাড়াই করে গুড় তৈরী করা হয় এবং স্থানীয় ভাবেই বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত গুড় বেচা কেনার জন্য বিভিন্ন জায়গায় বাজার বসে এবং এখানকার গুড় উৎকৃষ্ট মানের হওয়ায় দেশের বিভিন্ন  জায়াগায় তা প্রেরণ করা হয়। শিবগঞ্জ বাজারের পূর্বদিকে বিশ্বরোডের পার্শ্বের গুড় পট্টি সবচেয়ে বড় গুড়ের বাজার।

 

 

 

সোনা মসজিদ স্থল বন্দরঃশিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় ১৯ কিমি উত্তরে শাহাবাজপুর ইউনিয়নে অবস্থিত দেশের উলেলখযোগ্য স্থল বন্দর সোনামসজিদ স্থল বন্দর। এ স্থল বন্দর দিয়ে সারা বছরই ফল, কয়লা, পাথর, মসলা ও কৃষি পন্য প্রভৃতি আমদানী হয়। এতে করে বন্দর অঞ্চলে গড়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার। এ বাজারে ব্যবসা বানিজ্যের অবস্থানও সবসময় রমরমা থাকে। এই পোর্টকে কেন্দ্র করে অনেক লোকজনের সমাবেশ ঘটায় ব্যবসা বানিজ্যের সকল সেক্টরে ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ব্যবসা বানিজ্য পরিচালনায় কেন্দ্র হিসেবে স্থানীয়ভাবে কিছু হাটবাজারও রয়েছে।

 

     নিচে কিছু হাট বাজারের নাম উল্লেখ করা হলো।

 

ক্রঃ নং

হাটবাজারের নাম

ইউনিয়ন

1       

শাহাবাজপুর হাট

শাহাবাজপুর

2      

আড়গাড়া পশুহাট ও তোহাবাজার

দাইপুকুরিয়া

3      

মির্জাপুর হাট

4       

কামালপুর হাট

5      

বাগবাড়ী হাট

6      

নামোটিকরী হাট

মোবারকপুর

7       

কানসাট হাট ও দৈনিক বাজার

কানসাট

8      

বাগীতলা হাট

9       

করিম বাজার

10   

নাককাটিতলা হাট

ধাইনগর

11    

ছত্রাজিতপুর হাট

ছত্রাজিতপুর

12   

রানীহাটি হাট ও দৈনিক বাজার

নয়ালাভাঙ্গা

13 

গোলাপের হাট

ঘোড়াপাখিয়া

14    

উজিরপুর হাট

উজিরপুর

15   

মনাকষা পশু হাটি ও দৈনিক বাজার

মনাকষা

16   

বিনোদপুর খাসের হাট

বিনোদপুর

17   

কালীগঞ্জ হাট

18   

বাখরআলী হাট

19   

চামার হাট

শ্যামপুর

20 

চককীর্তি হাট

চককীর্তি

21   

চান্দপুর হাট

1শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যঃ

 

শিল্পঃবাংলাদেশের অন্যান্য অধিকাংশ উপজেলার মতো শিবগঞ্জও মূলত কৃষি নির্ভর উপজেলা। এখানে শিল্প তেমন ভাবে বিকশিত হতে পারেনি। তবে কিছু কিছু কুটির শিল্প এখনও টিকে রয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলায় উল্লেখযোগ্য কুটির শিল্পের মধ্যে রয়েছে- রেশমের কাপড় তৈরী, মিষ্টান্ন শিল্প , কাঠ শিল্প ইত্যাদি।

 

নীল ও বস্ত্র-শিল্পঃপূর্বে Indigo Industry বা নীল শিল্প এ অঞ্চলেও ছিল। রানীহাটি, কানসাট, শিবগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ আজও নজরে পড়ে। এই অঞ্চলেও কুঠিয়াল সাহেবদের অত্যাচারের কাহিনী শোনা যায়। শিবগঞ্জ উপজেলার পৌরসভা ও নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নে বর্তমানে সূতী কাপড় প্রস্ত্তত হয়ে থাকে। এখানে কিছু কিছু গামছাও প্রস্ত্তত হয়।

 

রেশম ও রেশমী বস্ত্র ঃকুটির শিল্পের মধ্যে এই উপজেলার রেশমই সর্বপ্রধান। পূর্বকালে এখানকার রেশমী বস্ত্র সুদূর ইউরোপে রপ্তানি হতো। শোনা যায় যে, হিন্দু রাজত্বের শেষের দিকে এই অঞ্চল হতে ঢাকা, সোনারগাও, সপ্তগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে বস্ত্র রপ্তানি হতো। ওলন্দাজ ও ইংরেজদের অধীনেও কয়েকটি রেশমের কারখানা ছিল। দিয়াড় অঞ্চল এককালে রেশম আবাদের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল রেশমের গুটিপোকা পালনে এবং সূতা কাটার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ভোলাহাট হলেও শিবগঞ্জ অঞ্চলেও বিস্তার লাভ করে। শিবগঞ্জে এখনও উৎকৃষ্ট মটকা ও রেশমের কাপড় তৈরী হয়ে থাকে। রেশম শিল্পকে উজ্জীবিত করিবার উদ্দেশ্যে নবাবগঞ্জ রেল স্টেশনের সন্নিকটে একটি উন্নতমানের সেরিকালচার নার্সারী হয়েছে। ভোলাহাটেও অনুরূপ একটি রেশমকীট পালনের নার্সারী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইউরোপীয়ান তাঁতশিল্পীগণ দেশ বিভাগ পর্যন্ত এখানে রেশমের কারাখানা চালু রেখেছিল। বহুলোক এখানে এ ব্যবসায়ে নিযুক্ত ছিল।

 

লাক্ষাঃএক সময় লাক্ষা চাষের জন্য সমগ্র বাংলায় শিবগঞ্জ উপজেলার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। সাঁওতাল পরগনা থেকে আগত সাওতালরা ১৮৬৪ সালে এই অঞ্চলে লাক্ষার চাষ প্রবর্তন করে। পাকিস্তান শাসন আমলে শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর দাদনচক মনাকষা প্রভৃতি অঞ্চলে হাজার হাজার লোক লাক্ষা চাষের সঙ্গে জড়িত ছিল। তবে বর্তমানে লাক্ষা চাষ অত্যন্ত সীমিত হয়ে এসেছে। অতীত ঐতিহ্য নিয়ে এখনও সীমিতভাবে মনাকষা ও বিনোদপুর অঞ্চলে কিছু কিছু লাক্ষা চাষ হচ্ছে।

 

মৃৎ শিল্পঃশিবগঞ্জ উপজেলায় প্রচুর আখ চাষ হওয়ায় স্থানীয়ভাবে গুড় তৈরী করে সংগ্রহের জন্য মাটির কলস/হাড়ী ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া কৃষকেরা ধানসহ অন্যান্য ফসলের বীজ সংরক্ষণের জন্য বড় বড় মাটির মটকা ব্যবহার করে। এসকল কারনে এখানে মৃৎ শিল্পের প্রসার ছিল। বর্তমানে উপজেলার চককীর্তি ইউনিয়নে এখনও কিছু কুমার শ্রেণীর লোক রয়েছে।

 

মিষ্টান্ন শিল্পঃমিষ্টান্ন শিল্পে শিবগঞ্জ অদ্যাবধি তার গৌরব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই অঞ্চলের বিখ্যাত ‘চমচম’ এবং ‘দম মিষ্টি’ এখনও সেরা। এখানকার কারিগর ৫কেজি পর্যন্ত ওজনের চমচম তৈরী করতে পারে। শিবগঞ্জ পৌরসভায় এবং কানসাট অঞ্চলে অধিকাংশ মিষ্টান্ন প্রস্ত্ততকারীরা বসবাস করে।

 

গুড় শিল্পঃসমগ্র শিবগঞ্জ উপজেলার প্রচুর আখের চাষ হয়। এ অঞ্চলে চিনি কল না থাকায় কৃষকেরা আখ থেকে গুড় তৈরী করে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত রাস্তার পাশে অসংখ্য অস্থায়ী চুলায় গুড় তৈরী করতে দেখা যায়।

 

কাঠ শিল্পঃকাঠ শিল্প শিবগঞ্জ উপজেলায় ক্রমান্বয়ে বিকশিত হচ্ছে। অসংখ্য মানুষ এ শিল্পের আয় থেকে জীবিকা নির্বাহ করে। কানসাট বাজারে বৎসরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে কাঠের আসবাবপত্রের মেলা বসে। এছাড়া উপজেলার অন্যান্য স্থানেও অনুরুপ কাঠের আসবাবপত্রের মেলা বসে।