মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

 ইতিহাস ও ঐতিহ্য

 

তথ্য সংগ্রহঃ উপজেলা গেজেটিয়ার, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

 

ইতিহাস প্রসিদ্ধ গৌড় ও প্রাচীন সভ্যতার সুতিকাগার বরেন্দ্র ভূমিরই অংশ শিবগঞ্জ উপজেলা। প্রকৃতপক্ষে শিবগঞ্জ তথা চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বতন্ত্র কোন ইতিহাস নেই। গেŠড় ও বরেন্দ্র ভূমির প্রাচীন ইতিকথাই শিবগঞ্জ উপজেলার প্রাচীন ইতিহাস। ঐতিহাসিকদের মতে গৌড়, সারস্বত, কান্যকুজ, মিথিলা ও উৎকল এ পঞ্চ গৌড় কোন এক সময় মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমানের কিয়দংশ ও মালদহ গৌড়ের অন্তগর্ত ছিল। সুতরাং মালদহের অংশ হিসেবে শিবগঞ্জও গৌড়ের অখন্ড অংশ এতে কোন সন্দেহ নেই। পঞ্চগৌড়ের উল্লেখ সর্ব প্রথম পাওয়া যায় রজতরঙ্গিনী গ্রন্থে। পরবর্তীকালে বহু জায়গায় পঞ্চগৌড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। গৌড় ও বরেন্দ্র ভূমির ইতিহাসকেই এখানে শিবগঞ্জের ইতিহাস হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে।

 

1প্রাচীন ইতিহাসঃ

বরেন্দ্র ভূমি নামকরণের পেছনে একাধিক পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। ‘বর’ শব্দের অর্থ আশীর্বাদ আর এ ‘বর’ শব্দ থেকেই বরেন্দ্র নামের উৎপত্তি। রামায়ন ও মহাভারত গ্রন্থদ্বয়ে বরেন্দ্র ভূমিকে ‘পুন্ডু’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। গৌড় রাজ্য সম্পর্কে কিংবদন্তীর অন্ত নেই। অনেকের ধারণা মগধে প্রদ্যোতন রাজারা যে সময় রাজত্ব করতেন সে সময় ভোজ নামক এক ব্যক্তি গঙ্গা পুলিণে গৌড় নগর স্থাপন করেন। তিনি অযোধ্যার অন্তর্গত গৌড়ের অধিবাসী ছিলেন। জন্মভূমির নামানুসারে স্বীয় প্রতিষ্ঠিত নগরীর তিনি নামকরণ করেন গৌড়। এ দাবি কতটা সত্য তা জানা যায়নি। তবে তা যদি সত্য হয়ে থাকে তবে গৌড় নগরী যে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকে নির্মিত হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর এ মতও প্রচলিত যে পুন্ডু নগরের কোন কোন অংশে গুড়ের খুব কারবার হতো বলেই চিনি বা গুড় ব্যবসায়ের নাম হতেই নাকি গৌড় নগরীর উৎপত্তি হয়। প্রাচীনকালে পশ্চিম ভারতের সাথে নদী পথে এখানকার ব্যবসা বাণিজ্য চলতো। নবাবগঞ্জের বিভিন্ন জায়গা এর কেন্দ্রভুমি ছিল। ব্যবসায় বাণিজ্যে এখানকার অধিবাসীরা খুব উন্নত ছিল। পোড়া নামে এক জাতি ছিল। তারা চিনি বা গুড় প্রস্ত্তত করার জন্য ইক্ষুর রসে তাপ দিত। পরবর্তীকালে এরা রেশমের সুতা কাটত। এদের নাম অনুসারেই পৌন্ড্রবর্দ্ধন নামের সৃষ্টি হয়। সেন বংশের রাজত্বকালে এ অঞ্চল বরেন্দ্রভুম বা বরিন্দা নামে পরিচিত হয়।

 

যদিও গৌড় রাজ্য সম্পর্কে নানা মত প্রচলিত তথাপি ও পাণিনি সূত্রে উল্লিখিত গৌড়পুর হতে আরম্ভ করে গৌড় শব্দের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় ভুখন্ডের দ্যোতক হিসাবে। তারপর কৌটিল্যও তার অর্থ শাস্ত্রে গৌড়, পুন্ডু, বঙ্গ এবং কামরূপের উল্লেখ  করেছেন। পাণিনির বিখ্যাত টীকাকার গীতাঞ্জলিও যেমন গৌড়ের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, সেরূপ পরিচিত ছিলেন তৃতীয় চতুর্থ শতকে বাৎসায়ন পুরাণেও এক গৌড় দেশের উল্লেখ আছে। আনুমানিক ষষ্ঠ শতকে বরাহ মিহির গৌড়ক, পৌন্ড্র, বঙ্গ, সমতট  ও তাম্রলিপ্তক নামে কয়েকটি পৃথক পৃথক জনপদের উল্লেখ করেছেন। ভাষাতেও গৌড়ীয় রীতির পরিচয় পাওয়া যায় রাজশেখরের কাব্য মীমাংসায় দন্ডীর কাব্যাদর্শে। এ সকল উল্লেখ ও প্রসঙ্গ হতে দেখা যায় যে, প্রাচীন সাহিত্যে গৌড়ের উল্লেখ অনেক জায়গাতেই রয়েছে। কিন্তু সেগুলো হতে নিঃসন্দেহে গৌড়দেশের সঠিক অবস্থিতি সম্বন্ধে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সুকঠিন। অষ্টম শতকে মুরারি অনর্থ রাঘবেঢ় উল্লিখিত গৌড় জনপদের রাজধানী চম্পা আদৌ এ দেশের সাথে সংশ্লিষ্ট কিনা সে সম্বন্ধে সন্দেহ হয়। কেউ কেউ নবাবগঞ্জের পপাই কে চম্পা বলে থাকেন। ভাগলপুরে এবং বর্ধমানের দামোদর নদের বাম তীরে চম্পা নামে নগরী ছিল। ধর্ম্মপালের সমসাময়িক খৃষ্টীয় শতকের শেষার্দ্ধে গৌড়ের রাষ্ট্রাধিকার যে বঙ্গদেশে বিস্তৃত ছিল এটি বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ আছে। গৌড় কখনও স্বতন্ত্র আবার কখনও বা রাঢ় এবং ভুরিশ্রেষ্ঠিকের অন্তর্গত বলে আখ্যাত হয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে যশোধরের গ্রন্থে দেখা যায় যে, গৌড় ভুখন্ড কলিঙ্গ (বর্তমান উড়িষ্যা) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ত্রয়োদশ ও চতুর্দ্দশ শতকে জোনদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভবিষ্য পুরান বা ত্রিকান্ড শেষ গ্রন্থে গৌড়কে পুন্ডু বা বরেন্দ্রীয় অন্তর্গত বলে উল্লেখ করা  হয়েছে। পুন্ড্রবর্ধণে যখন যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নবাবগঞ্জেও তখন সে শাসন বিস্তৃত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে কখন থেকে এ অঞ্চল সার্বভৌম শাসনকর্তার শাসনে শাসিত হতে থাকে তার কোন সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। আর্যদের আগমন এদেশে কখন ঘটেছিল সে সম্পর্কে কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। কেউ কেউ অনুমান  করেন যে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বছর আগে আর্যরা এদেশে এসেছিল। দুর্ধর্ষ আর্যরা আর্যাবত অর্থাৎ উত্তর ভারতে প্রথম দিকেই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু চতুর্থ শতাব্দীতে গুপ্ত সম্রাটগণ কর্তৃক বাংলাদেশে অধিকার প্রতিষ্ঠার পূর্বে কোন আর্যশক্তি এদেশ অধিকার করেছিল এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকদের মতে, গুপ্ত সম্রাটগণই ভারতে সর্বপ্রথম এক সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। গুপ্ত শাসনের পর সামন্তরাজা শশাঙ্ক এক বিরাট স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে মাহরাজাধিরাজ উপাধি লাভ করেন। তার সময়ে বাংলার সীমানা বহুদুর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। তিনি সম্ভবত ৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার মৃত্যুকালে (৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে) গৌড় তার রাজ্যভুক্ত হওয়ায় নবাবগঞ্জ নামক ভু-খন্ডটি সে সময় তার রাজ্যভুক্ত হয়েছিল  এতে কোন সন্দেহ নেই। মহারাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর গৌড় রাজ্য সম্রাট হর্ষবর্ধন ও তার মিত্র কামরূপরাজ ভাষ্কর বার্মার অধীনে চলে যায়। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর (৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ) অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বহিঃশক্তির বার বার আক্রমণের ফলে গৌড়ের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে শতবর্ষব্যাপী এক বিভীষিকারময় অন্ধকার যুগের সূচনা হয়। এ সময়কালকে ঐতিহাসিকগণ মাৎস্যন্যায় যুগ বলে বর্ণনা করেছেন। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে একশ বছর সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত গৌড় রাজ্যে মাৎস্যন্যায় যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে প্রথম পাল নৃপতি গোপালের রাজ্যজয়ের মাধ্যমে। তিনি সমগ্র রাজ্যে শান্তিও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার বংশ প্রায় ৪০০ বছর ধরে এদেশে রাজ্ত্ব করেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ধর্মপাল (৭৭০-৮১০), দেবপাল (৮১০-৮৫০) ও রামপাল (১০৭৭-১১২০) এ বংশর কয়েকজন খ্যাতিমান নৃপতি।

 

দশম শতাব্দীর দিকে কম্বুজাম্বয়জ পরিচয়বহনকারী এক রাজবংশ গোপালের বংশধরদের বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করে। একাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে পাল বংশের নবম রাজা মহীপাল ( ৯৮০-১০৩০) পাল বংশের গৌরব আংশিক উদ্ধার করেন। একাদশ শতাব্দীতে দিব্যক নামক একজন বৈর্ত বংশীয় সামন্তরাজা পালদের বিতাড়িত করে গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করেন। তার ভ্রাতা রোদক ওরাদকের পরে তার পুত্র ভীম রাজা হন। রামপাল পরবর্তীতে ভীমকে পরাজিত ও নিহত  করে পিতৃরাজ্য পুনরাধিকার করেন। রামপালের পরই পালরাজ শক্তি অত্যন্তদূর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পাল নৃপতি মদনপালের সময়ে (১১৪০-৫৫) সেনরা গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করেন। কর্ণাটক থেকে আগত রাঢ় অঞ্চলের বসবাসকারী সামন্ত সেনের পৌত্র ও হেমন্তসেনের পুত্র বিজয় সেন (১০৯৭-১১৫৮) ছিলেন সেন বংশের প্রথম নৃপতি। বিজয় সেনের মৃত্যুর পর তার পুত্র বল্লাল সেন বঙ্গের সিংহাসনে আরোহণ করেন। নবাবগঞ্জে এখনও তার অসংখ্য কীর্তির স্বাক্ষর রয়েছে। তন্মধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত বালুয়াদীঘি ও গোমস্তাপুর উপজেলার মকরমপুর ঘাটে অবস্থিত শ্মশান বাড়ি অন্যতম। তার পুত্র লক্ষ্মণ সেন (১১৭৯-১২০৫) এর সময়ে বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটে।

 

1মধ্য যুগের ইতিহাসঃমুসলিম শাসন আমলের শুরু থেকেই মূলত এ অঞ্চলের মধ্যযুগীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে গৌড় রাজ্য (লখনৌতি) অধিকার করেন। সে সময় গৌড়ের শাসনকর্তা ছিলেন সেন বংশের বৃদ্ধ রাজা লক্ষণ সেন। তিনি তখন নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন। কোন প্রতিরোধ না করে নদীপথে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। উত্তর ও উত্তর পশ্চিম বাংলা বখতিয়ার অধিকার করেন এবং লক্ষণাবতীকে (গৌড়) কেন্দ্র করে বাংলায় মুসলিম সাম্রাজের প্রতিষ্ঠা করেন। বখতিয়ার খলজীর পরবর্তী সময়ে ইয়াজউদ্দীন মহম্মদ ই শিরাণ (১২০৫-০৮), আলাউদ্দীন আলী মার্দন (১২০৮-১১), হুসাম উদ্দীন গিয়াস উদ্দীন ইওয়াজ (১২১১-২৬), নাসিরুদ্দীন মাহমুদ (১২২৬-২৯), ইজুল মুলক আশাউদ্দিন জানি (১২২৯), সাইফউদ্দীন আইবেক (১২২৯-৩৩) ও ইয়াজ উদ্দীন তুঘরিল তুঘান খান (১২৩৩-৪৪) গৌড় শাসন করেন। তিনি ছিলেন দিল্লীর গিয়াস উদ্দীন বলবনের প্রতিনিধি। পরে বিদ্রোহী হলে বলবন তাকে পরাজিত ও নিহত করে নিজ পুত্র নাসিরউদ্দীন বুঘরা খানকে গৌড়ের সিংহাসনে বসান। পরবর্তীতে সুলতান শামসউদ্দীন ফিরোজ শাহ, জালাল উদ্দীন মাহমুদ শাহ, শিহাব উদ্দীন বুঘরা শাহ, গিয়াস উদ্দীন বাহাদুর শাহ, নাসির উদ্দীন ইব্রাহিম এবং শিহাব উদ্দীন ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লীর অধিনে থেকে গৌড় শাসন করেন। চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৩৩৮) সোনারগাঁয়ে সুলতান ফখরউদ্দীন মোবারক শাহ (১৩৩৮-৪৯) দিল্লীর অধীনতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে বাংলার স্বাধীন সুলতান রূপে রাজতব করতে থাকেন। সুলতান ফখরউদ্দীনের পর তার পুত্র শামস উদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪৯-৫৮) তার পুত্র সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-৯০) নামধারণ করে গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। জালাল উদ্দীনের মৃত্যুর পর তার পুত্র শামস উদ্দীন আহমদ শাহ (১৪৩১-৪২) গৌড় শাসন করেন। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হলে ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান আসির উদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৪২-৫৯) গৌড়ের সিংহাসনে আরোহন করেন। ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই রাজবংশের নৃপতিগণ গৌড় শাসন করেন। এ বংশের রাজত্বের শেষ দিকে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং পর  পর কয়েকজন হাবসী সুলতান কয়েক বছর রাজত্ব করেন।

     

      ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করেন এবং দক্ষতার সঙ্গে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তার গৌরবময় রাজত্বকালে ছোট সোনা মসজিদ নির্মিত হয়। প্রজাদরদী নৃপতি আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র নাসির উদ্দীন নসরৎ শাহের রাজত্বকালে (১৫১৯-৩২) শের শাহ এদেশ অধিকার করেন। শের শাহের সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালের (১৫৩৭-৪৫) পর মোঘলশক্তি শের শাহের স্বগোত্রীয় পাঠান আমিরদের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকার নিয়ে লড়াই চলে দীর্ঘদিন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে বাংলাদেশে মোঘল শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। দিল্লী ও আগ্রাতে অবস্থানরত বিভিন্ন মোঘল সম্রাটের রাজত্বকালে তাদের নিযুক্ত সুবাদারগণ বাংলাদেশ শাসন করেন।

 

এসব সুবাদারদের মধ্যে শাহাজাদা সুজার (১৬৩১-৫৯) বেশ কিছু কীর্তি শিবগঞ্জে আজও রয়েছে। তিনি ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ অঞ্চল শাসন করেন। তার কাছারী বাড়ির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে শিবগঞ্জ উপজেলার ফিরোজপুরে। তার সময়ে গৌড়ের পূর্বাঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য হযরত শাহ নেয়ামতুল্লাহ (রঃ) এখানে আসেন। সুলতান তাকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা জানান এবং তার হাতে বায়াত হন। পরে তিনি গৌড় নগরীর উপকন্ঠে শিবগঞ্জ উপজেলায় ফিরোজপুরে স্থায়ীভাবে আস্তানা স্থাপন করেন। কথিত আছে যে, শাহ সুজা যখন ফিরোজপুরে তার মুর্শিদ শাহ নেয়ামতুল্লাহকে দেখতে আসতেন তখন তার অস্থায়ী নির্বাসের জন্য অট্টালিকাটি নির্মিত হয়। সম্রাট মহিউদ্দীন আলমগীর আওরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭) এই কামেল আওলিয়াকে ৫০০০ (পাচঁ হাজার) টাকা আয়ের সম্পত্তি মদদ-ই-মাস স্বরূপ তার ও তার বংশাবলীর ভরণপোষণের জন্য দান করেন। হযরত শাহ নেয়ামতুল্লাহ (রঃ)- প্রায় ৩৩ বছর ফিরোজপুরে বসবাস করেন।

 

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা গৌড় নগরীর অবক্ষয়ের প্রধান কারণ ছিল বলে মনে করা হয়। যখন চট্টগ্রামকে নিয়ে আরাকান, ত্রিপুরা ও বাংলা এবং পরে পর্তুগিজ ভাগ্যান্বেষীদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়, তখন শেরশাহ কর্তৃক গৌড় বিজয় ও লুন্ঠনের ফলে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ হতে ভাগীরথী অঞ্চল বিশেষ করে এর উপরের অংশ স্থিতিহীন হয়ে পড়ে। গৌড়ে তিন মাস স্থায়ী স্বাচ্ছন্দময় জীবনযাপন কালে হুমায়ুন এ নগরীকে জান্নাতাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এ সময়ে হোসেনশাহী বংশের বিলুপ্তি ঘটে। যখন পর্তুগিজ ব্যবসায়ীগণ প্রথমে সপ্তগ্রামে পরে হুগলিতে বসতি স্থাপন করে, তখন তাদের দুঃসাহসী স্বদেশীয়রা উপকুলীয় অঞ্চলে লুটপাট করেছিল। এতে বাণিজ্যপথ বিঘ্নিত হয়। মুগল পাঠানদের লড়াইয়ের অব্যবহিত পরে আসে চূড়ান্তআক্রমণ। এতে কার্যত বাংলার উত্তরাংশ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এ ধরনে অবিরাম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির ফলে জনবহুল শহরের রক্ষণাবেক্ষণ অবহেলিত হয়। ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ভিনসেন্ট ল্য গৌড় নগরীর অংশসমূহে জলাবদ্ধতা দেখেছেন। এতে বোঝা যায় যে, খালসমূহ যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় নি। এর ফলে প্লেগ রোগ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিদিন তিনশত লোকের মৃত্যু ঘটে। এ রোগে মুনিম খানও প্রাণ হারান। সম্ভবত মহানন্দা ও গঙ্গার সঙ্গে নগরীর খালসমূহের মাধ্যমে যে সংযোগ ছিল তা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। গঙ্গা নদীর গতিপথ পশ্চিমদিকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কারণে ও তা ঘটতে পারে । ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে পর্তুগিজদের দ্বারা  মালাক্কা দখল হওয়ায় গৌড় সম্পগ্রাম এবং দক্ষিণ পূর্ব এলাকায় মুসলমান ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহণে সমস্যা সৃষ্টি হয়। যুগপৎ নৈরাজ্য এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে গৌড় নগরীর বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বিলীন হতে থাকে। মুগল বিজয় এবং নদীর পূর্বতীরে তান্ডা থেকে রাজমহলে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ায় একটি নতুন তাৎপর্যময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা গৌড় নগরীর পতনকে নিশ্চিত করে।

 

উনিশ শতকের শেষদিক হতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী লেখাসমূহ স্বাধীন বাংলার প্রতীক হিসেবে গৌড়ের উপর নিবদ্ধ ছিল। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, রমাজপ্রসাদ চন্দ, রাখালদাস বন্দো্যাপাধ্যায়, রজনীকান্তচক্রবর্তী, চারুচন্দ মিত্র এবং অন্যান্যরা প্রাক মুগল রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন। এরা আঞ্চলিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে নয় বরং বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে গৌড়ের উপর তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন । কিন্তু অল্প কয়েকটি ব্যতীত নগরের ধ্বংসাবশেষসমূহ এবং নগরটি ইতিহাসবিদদের দৃষ্টির বাইরেই ছিল। ফলে হুমায়ুনের জান্নাতাবাদ একটি হারানো ও বিস্মৃত নগরীতে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় মোঘল শক্তি হীনবল হয়ে পড়লে বাংলার সুবাদারগণ নামেমাত্র মোঘল আধিপত্য পেলেও প্রকৃত প্রস্তাবে তারা স্বাধীনতাভাবেই রাজত্ব করছিলেন। সে সময় নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-৫৬) নবাব সরফরাজ খানকে (১৭৩৯-৪০) পরাজিত ও সিংহাসানচ্যুত করে বাংলা বিহার উড়িষ্যার সিংহাসনে আরোহন করেন। আলীবর্দী খার সময়েই এ এলাকার নাম নবাবগঞ্জ হয়।

 

1সাম্প্রতিক ইতিহাসঃশিবগঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রতিক ইতিহাস আলোচনায় বৃটিশ শাসন আমল ও পাকিস্তানী শাসন আমল সহ উল্লেযোগ্য ঘটনাবলীই মূলত আলোচনা করা হয়েছে। এ অঞ্চলের ইতিহাস খুব প্রাচীন হলেও নবাবগঞ্জ তথা শিবগঞ্জের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। নবাবগঞ্জ প্রাক ব্রিটিশ যুগ পর্যন্ত নবাবদের বিহারভূমি হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে লোকালয় গড়ে উঠলে স্বাভাবিকভাবে সেখানে নানা পরিবর্তন ঘটতে থাকে। তবে একথা সত্যি যে, নবাবগঞ্জ শহরে থানা স্থাপন খুব বেশী দিনের কথা নয়। পূর্ণিয়া ও দিনাজপুর জেলা ভেঙ্গে মালদহ জেলা গঠিত হয় ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একে কোন কালেক্টরের অধীন দেয়া হয়নি। Mr. Ravan Show মালদহ জেলার প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর নিযুক্ত হন। এ সময় শিবগঞ্জ ও কালিয়াচক থানা দুটি অপরাধপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি ছিল। শিবগঞ্জে অবস্থিত তরতীপুর  সে সময় বড় নদী বন্দর ছিল। লালগোলা ঘাট থেকে মহানন্দা নদীর উপর দিয়ে শিবগঞ্জ ভোলাহাট, ইংরেজ বাজার হয়ে রাজমহল পর্যন্ত এবং পদ্মার ওপর দিয়ে মনিহার ঘাট, সাহেবগঞ্জ মুঙ্গের ভাগলপুর প্রভৃতি স্থান পর্যন্ত স্টিমার যাতায়াত করতো। কালক্রমে নদী ভরাট হয়ে স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।। শিবগঞ্জ থেকে নদী দূরে সরে যাওয়ায় জনগণের অসুবিধা বেড়ে যায়। এসব কারণে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে মুন্সেফ চৌকি শিবগঞ্জ থেকে নবাবগঞ্জে স্থানান্তরিত হয়।। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ অঞ্চল রাজশাহীর জেলার অর্ন্তভূক্ত ছিল। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্তবিহার  ভাগলপুরের অন্তর্গত ছিল। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তদানীন্তন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশসহ এ অঞ্চলটি আবারও রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভূক্ত করা হয় এবং তা মালদহ জেলাধীন থাকে।

 

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের সময় র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুসারে নবাবগঞ্জ ও তার পার্শ্ববর্তী শিবগঞ্জ, নাচোল, ভোলাহাট ও গোমস্তাপুর থানাকে মালদহ থেকে বিছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার অন্তর্ভূক্ত করা হয়। শাসন ব্যবস্থার সুবিধার্থে ১৯৪৮ খিস্টাব্দের ১লা নভেম্বর রাজশাহী জেলার একটি থানা ও দিনাজপুরের অন্তর্ভূক্ত পোরশা থানা নিয়ে একটি নতুন মহকুমার সৃষ্টি হয় এবং নবাবগঞ্জ শহরে মহকুমা সদর দফতর স্থাপিত হয়। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি লেঃ জেঃ (অবঃ) হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ প্রশাসনকে জনগণের দোর গোড়ায় পৌছে দেয়ার লক্ষ্যে থানাগুলোকে উপজেলা এবং মহুকুমাকে জেলায় রূপান্তরিত করেন। এ পদক্ষেপের কারণে নবাবগঞ্জের ৫টি থানা শিবগঞ্জ, নাচোল, ভোলাহাট, গোমস্তাপুর ও নাবগঞ্জ সদর উপজেলায় উন্নীত হয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধ ও শিবগঞ্জ

 

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো স্বাধীনতা যুদ্ধে শিবগঞ্জ উপজেলা তথা চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এ অঞ্চলেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন অন্যতম বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণআন্দোলন এবং ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ সর্বক্ষেত্রেই এ অঞ্চলের অংশগ্রহণ ছিল সক্রিয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের উপর পশ্চিমাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ছিল নবাবগঞ্জের ইপিআর এর সেক্টর হেড কোয়ার্টার। তাই নবাবগঞ্জ তথা এ অঞ্চলের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এখান থেকেই। ২৬ মার্চের সন্ধ্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইপিআর হেড কোয়ার্টারে শুরু হয় বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালীদের নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ। ২/৩ ঘন্টা গোলাগুলির পর পরিস্থিতি বাঙ্গালিদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বহু অস্ত্রশস্ত্রসহ পশ্চিম পাকিস্থানী জেসিওকে বন্দি করা হয়। জনতা ও ইপিআর এর হাতে সেদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থানরত বেশ কিছু ইপিআর সদস্য নিহত হয়। ২৭ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল প্রায় ১ মাস শিবগঞ্জ উপজেলা শত্রু মুক্ত ছিল।

 

+শিবগঞ্জ থানা সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটিঃ

স্বাধীনতার আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সারাদেশে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সেই মোতাবেক শিবগঞ্জ থানায় ডাঃ মইনুদ্দীন আহমেদকে আহবায়ক ও আজিজ-উদ-দৌলাকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৩৫ সদস্য বিশিষ্ট সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির নেতারা থানার মধ্যে মিছিল মিটিং ও জনগণকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। শিবগঞ্জ থানাকে পাক প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙ্গে মুক্ত করার জন্য সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে শিবগঞ্জ থানা ও মনাকষা ইপিআর ক্যাম্প-এ ঘিরে থানার পুলিশ ও ইপিআরকে আত্মসমর্পণ করিয়ে তাদের কাছে থেকে অস্ত্র হাতিয়ে নেয়। সেই অস্ত্র ডাঃ মইনুদ্দীন এর কাছে জমা হয়। পরে তা মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার হয়। নবাবগঞ্জ পাকিস্তানী আর্মির দখলে চলে গেলে শিবগঞ্জ থানার সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি দুর্বল হয়ে পড়ে। নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য নেতারা এদিক ওদিক আত্মগোপন করে। তারা অনেকেই ভারতের মালদহ শহরে অবস্থান করে স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতার জন্য ভারতের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।

 

+নবাবগঞ্জে পাকসেনার প্রবেশঃ

২২শে এপ্রিল, ১৯৭১ পাকিস্তানী বাহিনী রাজশাহী হতে তাদের বহর নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-এ প্রবেশ করে এবং শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তোলে। নবাবগঞ্জে অবস্থানের কয়েকদিন পর পাকসেনারা শহর হতে চারিদিকে মাইকিং করে জনসাধারণকে শহরে আসার ও দোকানপাট খোলার জন্য আহবান করে। পাক সেনার আহবানে কিছু লোক সাড়া দিয়ে শহরে প্রবেশ করে এবং দোকানপাট খোলে। দ্বিতীয় দিনে প্রথম দিনের চেয়ে কিছু বেশি, তৃতীয় দিনে আরও কিছু বেশি লোক শহরে প্রবেশ করলে পাকসেনারা শহরে প্রবেশকারী লোকদের ধরে মহানান্দা নদীর তীরে শশ্মান ঘাটে নিয়ে এসে সবাইকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে এবং একটি বড় গর্তে মাটি চাপা দিয়ে পুঁতে ফেলে।

 

+পাকিস্তানী সেনার শিবগঞ্জ থানায় প্রবেশঃ

নবাবগঞ্জ শহরে অবস্থানকারী পাকসেনারা শিবগঞ্জ অভিমুখে রওনা হবে লোক মুখে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে। শিবগঞ্জ যাবার পথে রাস্তার উভয় পার্শ্বের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিবে শুনে বারঘোরিয়া থেকে শিবগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তার পার্শ্ববর্তী লোকজন আতঙ্কিত হয়ে সাধ্যমত বাড়ির মালামালসহ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। ৩০শে এপ্রিল পাকসেনারা গাড়ীর বহর নিয়ে সকাল ৯টায় দিকে নবাবগঞ্জ ফেরিঘাট পার হয়ে শিবগঞ্জ অভিমুখে যাত্রা করে। পাকসেনারা শিবগঞ্জ বাজারে ঢুকে প্রথম সংগ্রাম কমিটির নেতাদের সন্ধান চালায়। শিবগঞ্জ বাজারে পাকসেনারা ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে এক দল কানসাট এবং অপর দল মনাকষা অভিমুখে যাত্রা করেন। পথে পুকুরিয়া ও কানসাট বাজারে বেশ কিছু হিন্দুর বাড়ি জ্বালায়। মনাকষা যাবার পথে প্রথমে ডাঃ মইনু উদ্দীন আহম্মেদের বাড়ী ও মনাকষা বাজারে কয়েকটি হিন্দুর বাড়ি জ্বালায়। সারাদিন নারকীয় কর্মকান্ড সেরে তারা বিকেলবেলা নবাবগঞ্জ ফিরে যায়। নবাবগঞ্জ ফিরে যাবার সময় তাদের অনুসারী কিছু লোকজনকে ডেকে শিবগঞ্জ থানায় একটি শক্তিশালী শান্তি কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়ে যায়। তাদের নির্দেশ মোতাবেক থানা ও ইউনিয়নের শান্তি কমিটি গঠন করা হলে পাক সেনারা অনুকুল পরিবেশ বুঝে ১৫/২০ মে, ১৯৭১ শিবগঞ্জ সিও অফিসে এসে ক্যাম্প স্থাপন করেন।

 

+শিবগঞ্জ পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমন

২৫শে আগষ্ট ১৯৭১ সাল, ৮ই ভাদ্র ১৩৭৮ সন বাংলা। শিবগঞ্জে অবস্থিত পাক বাহিনী ক্যাম্প আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে বিনোদপুর থেকে ৫টি নৌকা যোগে ডাঃ মইন উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে শিবগঞ্জ অভিমুখে রওনা দেয়। সঙ্গে মোঃ ফাইজুর রহমান (বিশু মাস্টার)ও ছিলেন। ভবানীপুর গ্রামের ভিতর দিয়ে নদী থেকে বিলে উপচিয়ে পানি পড়া খাল বরাবর নৌকাযোগে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত স্রোতের কারণে নৌকা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একটি নৌকা আড়াআড়িভাবে পিঠালী গাছে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে যায় ও যোদ্ধারা অস্ত্রসহ ছিটকে পড়ে। পানিতে পড়া মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে এবং উদ্ধার করতে এক ঘন্টা সময় লেগে যায়। বন্যায় কুমিরাদহ বিলের থৈ থৈ পানিতে দিক নির্ণয় করা খুব কঠিন হয়ে যায় এবং দুর্লভপুর পৌছেতে সকাল হয়ে যায়। শিবগঞ্জের ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি দলে বিভক্ত হওয়ার কথাছিল। একদল তর্ত্তীপুর ঘাট থেকে ও অপর একটি দল কালুপুর উত্তর পাড়া জুম্মা মসজিদে পাশ দিয়ে সরাসরি ক্যাম্প আক্রমণ করার কথা এবং তৃতীয় দলটি ডাঃ মইন উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে দুর্লভপুর হাই স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে মরহুম সুবেদার আনেশুর রহমানের নেতৃত্বে  ৬র্ মর্টারসহ অন্যান্যভারী অস্ত্রের মাধ্যমে মূল ক্যাম্পে আক্রমন পরিচালনা করা হয়। এছাড়া অন্য দুটি দলকে আলো প্রকাশিত হওয়াই দূর থেকে আক্রমণ করতে হয়েছিল। ঐ দুটি দলকে ফিরিয়ে আনার জন্যে ক্যাম্পের উপর মর্টারিং করা হয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে এ আক্রমণ চালানো হয়। ঐ দু’টি দল সরাসরি পাক বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ না করে কালুপুরে অবস্থানকারী রাজাকারদের উপর আক্রমণ চালায়। পাকসেনা ও রাজাকারদের অনেক ক্ষয়-ক্ষতি করে মুক্তি যোদ্ধারা বিনোদপুর ফিরে যায়।

 

+কালুপুর গ্রামে অবস্থানরত রাজাকারদের উপর আক্রমনঃ

 

০৯/০৯/১৯৭১ খ্রিঃ তারিখ রাত্রী ১২.৩০ মিঃ সময় ৩টি নৌকা যোগে ১৫ জন যোদ্ধা নিয়ে কমান্ডার ওমর সাহেবের নেতৃত্বে কালুপুরের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবেশ করে ও রাজাকারদের বাঙ্কারে আক্রমণ চালায়। ২ (দুই) জন রাজাকার কে হত্যা করা হয় এবং ৩ (তিন) জনকে আহত করা হয়। বাকী সমস্ত রাজাকার কালুপুর ত্যাগ করে শিবগঞ্জ পালিয়ে যায়।

 

+প্রতিরোধ ও গেরিলা যুদ্ধঃ

কলাবাড়ী যুদ্ধঃ ২০ আগস্ট কলাবাড়ী নামক স্থানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। ১৯ আগস্ট, কলাবাড়ীতে মুক্তিবাহিনীর দুটি প্লাটুনের সঙ্গে পাকসেনাদের এক সংঘর্ষে মুক্তিবাহিনীকে ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে কলাবাড়ী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। কলাবাড়ী পাকসেনাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবার সংবাদে মিত্রবাহিনীর অফিসার মেজর থাপা মুক্তিবাহিনী সুবেদার মেজর এম.এ মজিদকে ২ প্লাটুন সৈন্য নিয়ে সত্বর কলাবাড়ী দখলের নির্দেশ দেয়। সুবেদার মেজর মজিদ ৬৪ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ১০ আগস্ট রাতেই কলাবাড়ী পুনরুদ্ধারের জন্য রওনা হন। রাত ৪টা ৩০ মিনিটে (১১ আগস্ট) তিনি তার বাহিনী নিয়ে কলাবাড়ী পৌছেন। পাকসেনারা নদী পেরিয়ে এসে কলাবাড়িতে ডিফেন্স পজিশনে অবস্থান করছিল। সুবেদার মেজর মজিদ তার বাহিনীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ভোর সাড়ে ৫টায় সময় পাকসেনাদের উপর চারদিক থেকে হামল  চালান। পাকসেনারা এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্ত্তত ছিলনা। উভয় পক্ষের মধ্যে দেড়ঘন্টা গুলি বিনিময় হয়। অবশেষে পাকসেনারা কলাবাড়ী ছেড়ে নদী পেরিয়ে কানসাটে চলে যেতে বাধ্য হয়। কলাবাড়ী মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে। এই সংঘর্ষে মুক্তিবাহিনীর তেমন কোন ক্ষতি হয়নি।

 

+পাকসেনার হাজার বিঘী অপারেশনঃ

হাজারবিঘী গ্রামটি পাগলা নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত। এ গ্রামের বেশ কিছু ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিল। গ্রামটি মুক্তিযোদ্ধাদের আওতাধীন থাকায় মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা দল যে কোন সময় সেই গ্রামের মধ্য দিয়ে আসা যাওয়া করত। তাই হাজারবিঘী গ্রামটি পাকসেনার অপারেশনের শিকার হয়। সেদিন ছিল শুক্রবার। পাক সেনারা হাজারবিঘী অপারেশনে প্রেরিত দলটি পুকুরিয়া ফেরিঘাট দিয়ে পার হয়। তারা দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে একটি দল গ্রামের উত্তর মাথা দিয়ে ও অপর দলটি দক্ষিণ মাথা দিয়ে গ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তখন বেলা প্রায় ২টা। জামে মসজিদে জুমার ফরজ নামাজ শেষ। কিছু মুসল্লি মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেছে। কিছু মুসল্লি সুন্নাত ও নফল নামাজ পড়ছে। এমন মুহূর্তে পাক হানাদার বাহিনী মসজিদটি ঘিরে ফেলে। নামাজ শেষে মুসুল্লিরা এক এক করে বের হতে থাকে। মুসুল্লিদের ধরে জমায়েত করে নিয়ে যায় পুকুরিয়া ফেরি ঘাটে। তাদেরকে সারিবদ্ধ করে লাঠি ও বেত দিয়ে পেটাতে থাকে। মসজিদ থেকে পাক আর্মিরা মানুষকে ধরে নিয়ে পেটানোর খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। মেয়েরা নিজের ইজ্জত বাঁচানোর জন্য বাড়ি ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নেয়।

 

+কানসাট আক্রমনঃ

২৩ আগস্ট তারিখে সুবেদার মেজর মজিদ এবং ক্যাপ্টেন ইদ্রিশ যৌথভাবে কানসাট আক্রমণ করেন। হামজাপুর সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন ইদ্রিশ একটি কোম্পানী নিয়ে সুবেদার মেজর মজিদের সাহায্যার্থে আসেন। পরিকল্পনা অনুসারে ক্যাপ্টেন ইদ্রিশ এবং সুবেদার মেজর মজিদ প্রায় দুটি কোম্পানী নিয়ে কানসাটে অবস্থানরত প্রায় এক কোম্পানী পাকসেনার উপর আঘাত হানেন। উভয়পক্ষের তুমুল সংঘর্ষে কানসাট মুক্তিবাহিনীর দখলে এলেও কিছুক্ষণের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সাহায্যকারী দল ঘটনাস্থলে এসে পড়ায় মু&&ক্তবাহিনীকে কানসাট ছেড়ে চলে আসতে হয়। এ সংঘর্ষে পাকসেনাদের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা প্রচুর বলে জানা যায়। ২৬ আগস্ট কানসাট পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর পুনরায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ক্যাপ্টেন ইদ্রিশ এবং সুবেদার মেজর মজিদ প্রায় দু'কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে নদী পেরিয়ে মরিয়া হয়ে কানসাট পাকসেনাদের উপর আঘাত হানেন। মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণে পাকসেনারা কানসাট ছেড়ে চলে যায়। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানী বাহিনীকে ধাওয়া করে প্রায় শিবগঞ্জ পর্যন্ত অগ্রসর হয়। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে পাকসেনারা পাল্টা আঘাত শুরু করে। র্চাঁপাই নবাবগঞ্জ থেকেও পাকসেনারা আর্টিলারি সাহায্য নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। ব্যাপক গোলাবর্ষণের মুখে মুক্তিবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এক সময় পাকসেনাদের আক্রমণের মাত্রা এতই তীব্র হয় যে, মুক্তিবাহিনী প্রায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। পাকসেনারা কানসাট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এ সংঘর্ষে সুবেদার মেজর মজিদসহ ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা গুরুতরভাবে আহত হয় এবং অস্ত্রশস্ত্র ও হারাতে হয় প্রচুর। পাকসেনাদের হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও শেষ কিছু হতাহত হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়।

 

+দাদনচক ও কালুপুর যুদ্ধ ঃ

শিবগঞ্জ বাজারে পাকবাহিনীর একটি ক্যাম্পে আক্রমণ চালানোর উদ্দেশ্যে ৫ মাইল দূরে পাগলা নদীর অপরপাড়ে দাদনচক কলেজের অধ্যাপক শাহাজান আলী ৩৩ জনের একটি বাহিনী নিয়ে অবস্থান নেন এবং শত্রুদের অবস্থানের খোজ খবর নিতে থাকেন। কিন্তু ইতোমধ্যে দালালদের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের খবর জানতে পেরে পাকবাহিনী দাদনচক কলেজকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। পায় ৩ ঘন্টা ধরে যুদ্ধ হয়। এতে শিবগঞ্জের সন্তান করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ, নিয়ামতপুরের আনিসুর, রাধাকান্তপুরের শামসুল, মানদার এনামুল, রামচন্দ্রপুরের মন্তাজ লড়াই করতে করতে শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধা হতাহতসহ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হন। পাকবাহিনীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য এই যুদ্ধে নিহত হন এবং অন্যান্যরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। অন্যদিকে কালুপুরে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

 

+ধোবড়া আক্রমন যুদ্ধঃ

ধোবড়া ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ও কলাবাগান হয়ে রাজার বাগান দাড়া বরাবর প্রায় দেড় কিলোমিটার ছিল শক্তিশালী ডিফেন্স। রাজার বাগান হতে পূর্ব দিকে ত্রিমোহনী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার বিল এলাকা। রাজার বাগান হতে ত্রিমহনী পর্যন্ত ছিল ফাঁকা। পাক সেনারা দাড়া যাতে পার হতে না পারে সে জন্য দাড়ার ভিতরের সমস্ত নৌকাগুলি পানির মধ্যে ডুবানো ছিল। পাক আর্মিরা দাড়া পার হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করার বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। ঘাতক রাজাকার ও পিস কমিটির প্রচেষ্টায় বহুদূর হতে গাড়ির উপর করে নৌকা এনে ফাকা দাড়ার উপর নৌকার ব্রীজ বানিয়ে রাত ১২টার দিকে পাক আর্মিকে পার করায়। পাক আর্মিরা দাড়া পার হয়ে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে ধোবড়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের পূর্ব দিকে এক বাগানে ডিফেন্স বসায়। সকাল হলে পাক আর্মিরা ধোবড়া গ্রামের পূর্ব দিকে বাড়ি ঘর জ্বালাতে থাকে। কলাবাগান ডিফেন্সের মুক্তিযোদ্ধারা পিছনে ঘেরার মধ্যে পড়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটার একমাত্র রাস্তা সোনা মসজিদ রোড। সেই রাস্তা ধরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু সরতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আর্টিলারি গোলা ও মেশিনগানের গুলি বৃষ্টির মতো পড়তে থকে। মুক্তিযোদ্ধারা সাপর্টিং ফায়ার চালিয়ে পিছু সরে চলে যায় সোনা মসজিদ চেক পোষ্ট বর্ডার। ধোবড়া ক্যাম্প চলে যায় পাক আর্মির দখলে।

 

     ধোবড়া পাক আর্মি ক্যাম্পঃধোবড়া পাক আর্মি ক্যাম্প ছিল খুব শক্তিশালী। ভারত সীমান্ত হতে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। বর্ডার রক্ষী ও সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় আর্মি আশংকা দুর করার জন্য ভারতের উচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, মুক্তিযোদ্ধাদের সর্ব প্রকার সামরিক সহায়তা দিয়ে শিবগঞ্জ থানাকে মুক্ত করে, বারঘোরিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ডিফেন্স বসাতে হবে। কিন্তু ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধোবড়া ক্যাম্প আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন।

 

ধোবড়া পাক আর্মি ক্যাম্প আক্রমণের পরিকল্পনাঃক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, ক্যাপ্টেন গিয়াস ও মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিঞা ধোবড়া আক্রমণের পরিকল্পনার ছক তৈরি করেন। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ঈদের পূর্ব রাতে রাত্রি ১১টায় আক্রমণ চালানো হবে। ছক মতে ক্যাপ্টেন গিয়াস তার দল নিয়ে ধোবড়ার পূর্ব দিক দিয়ে ধোবড়া মুখে অগ্রসর হবেন, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর তার দল নিয়ে সড়কপথে সরাসরি আক্রমণ চালাবেন এবং মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিঞা এর গেরিলা দলটি ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পশ্চিম পার্শ্বে থেকে সার্পোট দেবেন। বাংকার চার্জ আরম্ভ হলো ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ওয়ারলেসের মাধ্যমে পিছনে আর্টিলারি দিয়ে বাংকারের আশেপাশে গোলা নিক্ষেপ করাচ্ছিলেন। ক্যাপ্টেন গিয়াস তার দল নিয়ে মারমুখী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধারা জানান বাংকার চার্জ করতে গিয়ে কয়েকটি বাংকার ফাঁকা পাওয়া যায়। তারা ভেবেছিলেন শত্রুপক্ষ হয়তো বাংকার ছেড়ে সরে গেছে। আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা শতভাগ সফলতা লাভ করেন। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সিগনাল দিলে মুক্তিযোদ্ধারা উইথড্রো হয়ে একসাথে জোরসে জয় বাংলা ধ্বনি তোলেন। ধ্বনি তোলার সাথে সাথে তারা ব্রাস ফায়ারের শিকার হয়। এ যুদ্ধে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান। এর প্রতিশোধ নিতে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর তার দলের বাছাইকৃত সাহসী ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ধোবড়া পাক আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ চালান। তাদের ক্যাম্পের সামনে জঙ্গল ও উচু কলাই ফসলের মাঠ। বেলা তখন প্রায় মধ্য দুপুর। পাক আর্মিরা ক্যাম্পের সামনে ফাঁকা জায়গায় জমায়েত হয়ে উৎফুল্ল মনে গোসলের আয়োজন করছে, জাহাঙ্গীরের মনে বিন্দুমাত্র ভয় নেই, কারণ পাক আর্মিরা গোসল করছে তাদের কাছে কোন অস্ত্র নেই। উচু কলাই ফসলের মধ্যদিয়ে চলে যান একবারে পাক আর্মির সামনে।এক সাথে গর্জে উঠে মুর্শিদাবাদের তিনটি এলএমজি ও বাইশটি রাশিয়ান এসএল আর। এ ঘটনায় পাক আর্মির অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের কোন ক্ষতি হয়নি এবং তারা অক্ষত অবস্থায় ক্যাম্পে ফিরে আসেন।

 

+রাজাকার ক্যাম্প উচ্ছেদ অভিযানঃ

পাক আর্মি তাদের শিবগঞ্জ ক্যাম্পকে নিরাপদে রাখার জন্য রাজাকার বাহিনী দিয়ে সাপোর্টিং ক্যাম্প হিসাবে রানীহাটি, রামচন্দ্রপুর হাট, রাধাকান্তপুর শিবগঞ্জ, আড়গাড়া আরও বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প বসায়। মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চিম দিক হতে পাগলা নদী পার হয়ে থানার বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা তৎপরতা চালাতে যাবেন। তাই পাক আর্মিরা ভীত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যাতে তাদের চলাচল রাস্তায় মাইন বসাতে না পারে, সেজন্য বারঘোরিয়া হতে শিবগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ২০ কি রাস্তার উপর ১ রশি পর পর ইট নিয়ে বাংকার তৈরি করে পাহারা দিত।

 

রামচন্দ্রপুর হাটের রাজাকারদের ক্যাম্প উচ্ছেদঃমুক্তিযোদ্ধাদের একটি গেরিলা দল চর পাকা থেকে এসে গভীর রাতে আক্রমণ চালিয়ে ক্যাম্প উচ্ছেদ করে। এখানে প্রচুর গোলাগুলি হয়। গোলাগুলিতে একজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান। তাকে মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ে যেতে পারেনি। স্থানীয় লোকজন তার দাফন কাফন সম্পন্ন করেন।

 

রাধাকান্তপুর আলিয়া মাদ্রাসার রাজাকার ক্যাম্প উচ্ছেদঃ

শিবগঞ্জ পাক আর্মির সাথে সরাসরি যোগাযোগের জন্য টেলিফোন লাইন বসিয়ে রাধাকান্তপুর আলিয়া মাদ্রাসায় রাজাকারেরা ক্যাম্প বসায়। মুক্তিযোদ্ধারা চলাচলের বিশেষ অসুবিধে ভেবে ইসমাইল মাস্টারের নেতৃত্বে ২৫/৩০ জনের একটি গেরিলা দল চর পাকা থেকে এসে গভীর রাতে দৌরশিয়া গ্রাম থেকে তাদের টেলিফোন লাইন কেটে প্রায় ১ কিলোমিটার তার জড়িয়ে পিছন থেকে রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। সাহসী মুক্তিযোদ্ধা মুনজুর আলী রাজাকারদের অবস্থান ঘরে জানালা দিয়ে গ্রেনেড চার্জ করলে গোলাগুলি শুরু হয় এবং এই গোলাগুলিতে কতজন রাজাকার মারা গেছে তা জানা যায়নি তবে সাহসী একজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। তাকে ভারতে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলে তিনি পথি মধ্যে মারা যায়। পরে তার নিজ গ্রাম চর পাকায় দাফন কাফন করা হয়। সেখানকার রাজাকার ক্যাম্প উচ্ছেদ হওয়ার পর আর ক্যাম্প বসাতে সাহস পায়নি।

 

+দৌরশিয়া গ্রামেমর্মান্তিক গণহত্যাঃ

রাধাকান্তপুর আলিয়া মাদ্রাসার রাজাকার ক্যাম্প উচ্ছেদের পর পাকবাহিনী প্রতিশোধমুলক দৌরশিয়া, পারঘোড়াপাখিয়া, ছোট লম্পট, বড় লম্পট ও রাধাকান্তপুর গ্রামে নারকীয় গণহত্যা চালায়। নদী পারাপারের জন্য চকের ঘাট এলাকায় প্রায় শতাধিক নৌকা জমা হতো। প্রত্যক্ষদর্শী মাঝিদের ভাষ্যমতে রাত বারটার পর শুধু পাক আর্মিরা নদী পার হয়ে নদী তীরে পজিশন নেয়। সকালে রাজাকার ও তাদের সমর্থনকারী পিস কমিটির লোক এবং তাদের গোলা বারুদ বহন করার জন্য কিছু জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে নদী পার হয়। নদী পার হয়ে প্রায় হাজার খানেক লোক আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিতে দিতে দৌরশিয়া গ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দৌরশিয়া গ্রামের অনতিদূরে তারা তিনভাগে ভাগ হয়ে প্রথম ভাগ যান পার ঘোড়াপাখিয়া গ্রামের দিকে, দ্বিতীয় ভাগ রাধাকান্তপুর ও মোল্লাটোলা গ্রামের দিকে ও তৃতীয় ভাগ দৌরশিয়া গ্রামের দিকে যান। ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ ইং দৌরশয়িা গ্রামে গিয়ে তারা গ্রামের চারদিক ঘিরে ফেলে এবং নিরীহ মানুষের উপর গুলিবর্ষণ আরম্ভ করে ও সেখানে ৪২জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। লোকজন জীবন বাঁচাবার জন্য এদিক সেদিক ছুটাছুটি শুরু করে। কিছু লোক প্রাণে বাঁচার জন্য জামে মসজিদে ঢুকে গিয়েও রেহাই পায়নি। মসজিদ থেকে টেনে টেনে রাস্তার উপর নিয়ে গুলি চালিয়ে তাদের হত্যা কর হয়। গণহত্যার পর তারা দক্ষিণ পশ্চিম মুখে গ্রামের দিকে চলে যায়। একই দিনে পার ঘোড়পাখিয়া গ্রামে ১৪ জন, বড় লম্পট গ্রামে ১০ জন, ছোট লম্পট গ্রামে তিন জন, রাধাকান্তপুর গ্রামে তিন জন গণহত্যার শিকার হয়। দৌরশিয়া একটি্ ছোট গ্রাম। পুরুষ লোকেরা গণহত্যার শিকার। কিছু লোক গুলি খেয়ে আহত। এক কবরে তাদের দাফন কাফন করা হয়। প্রাণে বেঁচে যাওয়া ২/৪ জন লোক মহিলাদের নিয়ে কোন রকমে গর্ত করে লাশ মাটি চাপা দেয়। এদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা।

 

+খাসের হাট ও মনকষার গণহত্যাঃ

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য মতে সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল ৭টার দিকে পাক আর্মি ও রাজাকার বাহিনী কানসাট নদী পার হয়ে খাসের হাটের দিকে যেতে থাকে। চলার পথে সামনে পড়া লোকজনকে সাথে নিয়ে খাসের হাটের দিকে এগিয়ে যায়। সকাল প্রায় ৯টার দিকে টাপ্পু ও চান শিকারী গ্রাম দুটি পাকবাহিনী ঘিরে ফেলে। সামনে পড়া লোকজনকে ধরে নিয়ে যায় খাসের হাট চত্বরে। সারাদিন বসিয়ে রেখে বিকেল ৫টার দিকে রাজাকারদের দিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। দু’টি গ্রামের বেশ কিছু বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। লোকজন ভয় ও আতংকে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরদিন ভয় ভীতি উপেক্ষা করে পড়ে থাকা লাশগুলির মধ্যে লোকজন নিজেদের আত্মীয়স্বজনের ১০/১২ জনের লাশ দাফন করেছিল। বাদবাকী লাশ কুকুর, শিয়াল, শকুন আর কাক, চিলের খাবার হয়েছিল। খাসের হাটের গণহত্যায় প্রায় ৬০/৬৫ জন লোক শহীদ হন। এ ঘটনার পর এলাকার লোকজনকে ঘরে ফেরার শক্তি ও সাহস যোগানের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা অনতিদূরে ক্যাম্প বসায়। কয়েকদিনের মধ্যে জনগণ ঘরে ফিরে যায়।

 

    মনাকষার গণহত্যাঃ

পাক হানাদার বাহিনীরা শিবগঞ্জ ঘাট পার হয়ে মনাকষা যাবার পথে সামনে পড়া লোকজনকে ধরে নিয়ে যায় মনাকষা হাট স্কুলমাঠে। সেখানে গুলি চালিয়ে হত্যা করে প্রায় ১৫/১৬ জনকে। এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে আরও হত্যা করে প্রায় ১২/১৪ জনকে।

 

+তেলকুপি যুদ্ধঃ

তেলকুপি গ্রামটি পূর্ব পশ্চিম দিকে লম্বা। পশ্চিম দিকে সীমান্ত ও পূর্বপ্রান্তে পাগলা নদী। গ্রামের মধ্যখানে বি.ও.পি ক্যাম্প। উক্ত গ্রামে অস্থায়ীভাবে মুক্তিযোদ্ধারা ডিফেন্স বসায় যাতে তাড়াতাড়ি থানাকে মুক্ত করা যায়। সে লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা চারিদিক থেকে গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিঞা এর নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী গেরিলা দলটিকে ঘায়েল করার জন্য তাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। কারণ তার  দলটি বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কিছু রাজাকারকে জীবিত ধরে নিয়ে যায়। পাক আর্মির আশংকা এ দলটি যে কোন সময় শিবগঞ্জ আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ চালাতে পারে। প্রতিরোধ হিসাবে তারা বিনোদপুরে পাক ও রাজাকার যৌথবাহিনী ক্যাম্প বসায়। তেলকুপি আক্রমণের পূর্ব রাতে ধোবড়া ক্যাম্পের কিছু পাক আর্মি তেলকুপি গ্রামের সামনে নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থান নেয়। তারা নদী পার হতে না পেরে তাদের মুল দলটিকে সার্পোটিং হিসাবে সাহায্য করে। মূল দলটি বিনোদপুর হতে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তেলকুপি গ্রামের দক্ষিণ পার্শ্বে উপস্থিত হয়ে সকাল ৮টার দিকে ফায়ার ওপেন করে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কম থাকায় তারা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে নীচু সরু ক্যানালে পজিশন নিয়ে পাক বাহিনীর ফায়ারের জবাব দেয়। তাদের ৩ ইঞ্চি মর্টারের সেল ও মেশিনগানের গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের উপর বৃষ্টির মত ঝরতে থাকে । অনতিদুরে থাকা শাহজাহান মিঞার গেরিলা দলটি তড়িঘড়ি করে তিনটি উপদলে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধরত দলের সাথে যোগ দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। বেলা প্রায় ১২টার দিক পাক আর্মিরা তাদের ফায়ার বন্ধ করে। কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত তাদের আর কোন সাড়া শব্দ নেই। মুক্তিযোদ্ধারা ভাবল তারা হয়ত পিছনে সরে গেছে। শাহজাহানের দলটি অনতিদুরে মুল আস্তানায় ফিরে যায় এবং খাওয়ার প্রস্ত্ততি নেয়। এমন সময় পাক আর্মিরা গোলাগুলি করতে আরম্ভ করে। গ্রামবাসীরা দৌড়ে এসে জানায় পাক আর্মিরা তেলকুপি গ্রামকে ঘিরে ফেলেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যে পাক আর্মি গ্রামের পশ্চিম দিক দিয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর রেঞ্জের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বর্ডার রক্ষীরা পাক আর্মির উপর সাপোর্টিং গুলি চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা নদীর ধার দিয়ে তাদের উত্তর দিকের অগ্রযাত্রাকে ঠেকিয়ে দেয়। পাক আর্মিরা বে-কায়দা দেখে পিছু সরতে থাকে। পিছু হটার সময় তারা বেশ কিছু বাড়িতে আগুন জ্বালায় ও লুটপাট করে।

 

+আড়গাড়া যুদ্ধঃ

আড়গাড়া হাটে  রাজাকারেরা একটি শক্তিশালী ক্যাম্প বসায়। রাজাকারেরা পাক আর্মির সহায়তা পেয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা পক্ষের লোকজনের নামের তালিকা তৈরি করে তাদের বাড়িঘর লুট থেকে শুরু করে চালায় নানা রকম নির্যাতন। তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কারো মুখ খোলার সাহস ছিল না। মানুষের জীবন তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এ সমস্ত তথ্য সোনামসজিদ চেক পোস্ট মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আসে। এ খবর শুনে মুক্তিযোদ্ধারা চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। মুক্তিযোদ্ধারা এলাকার রাজাকার ক্যাম্প উচ্ছেদের পরিকল্পনায় কাশিয়া বাড়ি ও বাজার এলাকায় ক্যাম্প বসায় সম্ভবত ১৯শে নভেম্বর। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, লেঃ আওয়াল ও লেঃ কাইয়ুম দলবল নিয়ে আড়গাড়া যুদ্ধে রওনা দেয়। তারা দুভাগে বিভক্ত হয়ে সকাল ৭টার দিকে প্রচন্ড কুয়াশার মধ্যে রাজাকার ক্যাম্পের উপর আক্রমণ চালায়। পেছন থেকে সার্পোটিং আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর রাজাকার ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যায়। তার নির্দেশে পিছন থেকে একটি গোলা রাজাকার থানা পাকঘরে পড়ে। ছাদ ধসে রাজাকার ক্যাপ্টেন গুরুতরভাবে আহত হয়। রাজাকাররা বেশিক্ষণ টিকতে না পেরে মালামাল ফেলে পালিয়ে জীবন বাঁচায়। এতে এলাকাবাসীর মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।

 

+সোনা মসজিদ ডিফেন্স যুদ্ধঃ

ধোবড়ায় পাক আর্মি প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়ায় প্রতিশোধ নিতে উদগ্রীব হয়ে উঠলে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর সীমান্ত হতে প্রায় ২ কিলোমিটার ভিতরে সোনা মসজিদ এলাকায় পূর্ব ও পশ্চিম দিকে লম্বা আমের বাগানে প্রায় ১ কিলো এলাকায় ডিফেন্স বসায়। এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধা ডিফেন্স রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। কারণ এখানকার ডিফেন্স উঠে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানার কোন জায়গা থাকবে না। জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে পাক আর্মির উপর আর্টিলারির সেল নিক্ষেপ এবং বৃষ্টির মত গোলাগুলির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যোগানের ব্যবস্থা নেয়া হয়। যুদ্ধ চলে বিকেল প্রায় ৪টা পর্যন্ত। হানাদাররা মুক্তিযোদ্ধাদের এক ইঞ্চিও পিছু সরাতে পারেনি। ১১ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের নিকট খবর আসে ধোবড়া ক্যাম্প হতে পাক আর্মি পালিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। তখন নিশ্চিত হওয়ার লক্ষ্যে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর এক দল মুক্তিযোদ্ধাকে পরীক্ষার জন্য গভীর রাতে সেখানে পাঠায়। মুক্তিযোদ্ধারা ধোবড়া পাক আর্মি ক্যাম্পের উপর বেশ কিছু গুলি চালায় কিন্তু পাক আর্মির কোন জবাব মেলেনি। মুক্তিযোদ্ধারা নিশ্চিত হয়ে ফিরে আসে, পাক আর্মিরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেছে। ১২ই ডিসেম্বর সাত সকালে জাহাঙ্গীর তার দলবল নিয়ে নবাবগঞ্জ সড়কপথে রওনা দেন। মুক্তিযোদ্ধারা ১১টার দিকে বারোঘরিয়া পৌছে ডিফেন্স গড়েন। তখনও নবাবগঞ্জ শহর মুক্ত হয়নি, পাক আর্মিরা জমায়েত হয়ে আছে। নদীর এপারে ওপার চলছে চরম যুদ্ধ। ১২ই ডিসেম্বর সকালে লোকমুখে ছড়িয়ে যায় যে পাক হানাদার বাহিনী শিবগঞ্জ থেকে পালিয়েছে গেছে। এ খবর পেয়ে মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবং সকাল হতে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়।

 

 মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনে অবালবৃদ্ধবনিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অভ্যর্থনা জানায়। আত্মীয়-স্বজন মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ খবর নিতে থাকে। স্বাধীনতার মুখ দর্শন করে অতীতের সব দুঃখকষ্ট ভুলে তাদের মুখেও হাসি ফোটে। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর তার দল নিয়ে আকুন বাড়িয়া ঘাট দিয়ে মহানন্দা নদী পার হয়ে ১৩ই ডিসেম্বর বিকেল বেলা টিকরামপুর গ্রামে অবস্থান নেন। ১৪ ডিসেম্বর সকাল হতেই পাক সেনা আর মুক্তিসেনা মুখোমুখি হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের জন্য মুক্তিসেনারা প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যান। জাহাঙ্গীর তার দল নিয়ে নবাবগঞ্জ শহরে ঢোকার জন্য রেহাইচর পাক আর্মির বাংকারের উপর আক্রমণ চালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। শেষ মুহুর্তে স্বপ্নের স্বাধীনতার মুখ তার আর দর্শন হল না। তিনি সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার পাশের  মুক্তিযোদ্ধারা নৌকাযোগে নদী পার করে জাহাঙ্গীরের লাশ একটি জীপে বহন করে সোনামসজিদ প্রাঙ্গনে নিয়ে যায়। ঐতিহাসিক সোনামসজিদের সামনে তাকে দাফন করা হয়।

 

তথ্য সংগ্রহঃ উপজেলা গেজেটিয়ার, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ৤